Flash Story
সূরা আল-লাহাব
সূরা আল-লাহাব: পরিচিতি, অর্থ, তাফসির ও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
নবীর জীবদ্দশায় যুদ্ধ
নবীর জীবদ্দশায় যুদ্ধ: মুহাম্মাদ (সা.)-এর জীবদ্দশায় সংঘটিত প্রধান যুদ্ধসমূহের ইতিহাস, কারণ ও ফলাফল
সূরা আল-ইখলাস
সূরা আল-ইখলাস: পরিচিতি, অর্থ, তাফসির ও শিক্ষা
সূরা আল-ফালাক্ব
সূরা আল-ফালাক্ব: পরিচিতি, অর্থ, তাফসির ও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
সূরা আন-নাস
সূরা আন-নাস: পরিচিতি, তাফসির ও মূল শিক্ষা
বাংলাদেশে ধর্ষণ ও হত্যা: মহামারীতে কি রূপ নিচ্ছে বাংলাদেশে? সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড ও সমাজের ভয়াবহ বাস্তবতা
ইরানে খামেনি নিহত
ইরানে খামেনি নিহত: ইরানে খামেনি যুগের অবসান ও ইতিহাস-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্য
ইরানে হামলা
ইরানে হামলা: ইরানজুড়ে মিসাইল ও এয়ারঅ্যাটাক – মার্কিন ও ইসরায়েলের যৌথ আক্রমণ বিশ্লেষণ।
ফের ভূমিকম্প
ফের ভূমিকম্প- রমাদান মাসের শুক্রবার জুম্মাহর নামাযের পর সারাদেশে ভূমিকম্প অনুভূত
সূরা আল-লাহাব
Share this article

সূরা আল-লাহাব: ভূমিকা-

সূরা আল-লাহাব এটি একটি সংক্ষিপ্ত মাক্কী সূরা। এই সূরায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চাচা আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর ইসলামবিরোধী অবস্থান, রাসুল (সা.)-এর বিরোধিতা এবং তাদের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে।

সূরাটি ছোট হলেও এর মধ্যে ঈমান, সত্যের বিরোধিতা, অহংকার, সম্পদের অপব্যবহার এবং আল্লাহর অবাধ্যতার পরিণতি সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে।

সূরা আল-লাহাবের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-

বিষয় তথ্য
সূরার নাম সূরা আল-লাহাব (اللَّهَب)
অন্য নাম সূরা আল-মাসাদ
সূরা নম্বর ১১১
আয়াত সংখ্যা ৫টি
রুকু সংখ্যা ১টি
পারা ৩০তম পারা
নাজিলের স্থান মক্কা
সূরার ধরন মাক্কী
নামের অর্থ প্রজ্বলিত আগুনের শিখা
প্রধান বিষয় আবু লাহাবের বিরোধিতা ও তার পরিণতি

আবু লাহাব কে ছিলেন-

আবু লাহাব ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চাচা। তাঁর আসল নাম ছিল আবদুল উজ্জা ইবনে আবদুল মুত্তালিব। রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তিনি ইসলামের বিরোধিতা করেন এবং রাসুল (সা.)-কে দাওয়াতের কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

‘আবু লাহাব’ অর্থ আগুনের পিতা বা আগুনের মতো উজ্জ্বল। তার চেহারার লালচে আভা বা উজ্জ্বলতার কারণে এই উপনাম প্রচলিত হয়েছিল বলে তাফসিরে উল্লেখ পাওয়া যায়।

আবু লাহাবের স্ত্রী কে ছিলেন-

উম্মে জামিল ছিলেন আবু লাহাবের স্ত্রী। তাঁর আসল নাম আরওয়া বিনতে হারব ইবনে উমাইয়া। তিনি মক্কার প্রভাবশালী বনু উমাইয়া বংশের নারী ছিলেন। তাঁর পিতা ছিলেন হারব ইবনে উমাইয়া এবং তিনি ছিলেন আবু সুফিয়ান ইবনে হারবের বোন। অর্থাৎ উম্মে জামিল ও আবু সুফিয়ান (রা.) ছিলেন ভাই-বোন। পরবর্তীতে আবু সুফিয়ান (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সাহাবি হিসেবে পরিচিত হন।

উম্মে জামিল আবু লাহাবের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। আবু লাহাব ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চাচা। আত্মীয়তার এই সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও আবু লাহাব ও উম্মে জামিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইসলামের দাওয়াতের কঠোর বিরোধিতা করেন।

ইসলামের বিরোধিতায় উম্মে জামিলের ভূমিকা-

উম্মে জামিল তাঁর স্বামী আবু লাহাবের সঙ্গে মিলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াতের বিরোধিতা করতেন। তিনি মানুষকে ইসলাম গ্রহণ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করতেন এবং রাসুল (সা.)-এর বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে অপপ্রচার ও নিন্দা করতেন। তাফসিরের বর্ণনায় তাঁর বিরুদ্ধে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চলার পথে কাঁটা বা ক্ষতিকর বস্তু রাখার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এই কর্মকাণ্ডের কারণে সূরা আল-লাহাবে তাঁকে “কাঠ বহনকারী” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাফসিরকারদের ব্যাখ্যায়, এর মধ্যে রাসুল (সা.)-এর পথে কাঁটা বহন করার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে শত্রুতা ও বিরোধ সৃষ্টি করার অর্থও বোঝানো হয়েছে।

উম্মে জামিলের ঘটনা থেকে বোঝা যায়, সত্যের বিরোধিতা করলে শুধু বংশ, সম্পদ বা সামাজিক মর্যাদা মানুষকে রক্ষা করতে পারে না। তাঁর ভাই আবু সুফিয়ান (রা.) পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করে সাহাবি হন, কিন্তু উম্মে জামিল ইসলামের বিরোধিতায় অটল ছিলেন।

যে ঘটনার প্রেক্ষাপটে সূরা আল-লাহাব নাযিল হয়-

সূরা আল-লাহাব নাযিল হওয়ার পেছনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন তাঁর নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করে আল্লাহর একত্বের দিকে আহ্বান জানান, তখন তিনি সাফা পাহাড়ে উঠে কুরাইশদের ডাকেন। সবাই সমবেত হলে তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, “আমি যদি বলি যে এই পাহাড়ের পেছন থেকে একটি শত্রুবাহিনী তোমাদের ওপর আক্রমণ করতে আসছে, তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে?” তারা বলেছিল, “হ্যাঁ, আমরা আপনার কাছ থেকে কখনো মিথ্যা কথা শুনিনি।”

এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের আল্লাহর শাস্তি থেকে সতর্ক করে ইসলামের দিকে আহ্বান জানান। তখন তাঁর চাচা আবু লাহাব ক্ষুব্ধ হয়ে রাসুল (সা.)-কে অপমান করে বলে, “তোমার ধ্বংস হোক! এ জন্যই কি তুমি আমাদের একত্র করেছ?” এই ঘটনার পর আল্লাহ তাআলা “তাব্বাত ইয়াদা আবি লাহাব…” দিয়ে সূরা আল-লাহাব নাযিল করেন।

এই সূরায় আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের নিন্দা করা হয় এবং তাদের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়।

সূরা আল-লাহাবে কী কী বিষয় বলা হয়েছে-

১. আবু লাহাবের ধ্বংসের ঘোষণা

সূরার শুরুতেই আবু লাহাবের দুই হাত ধ্বংস হওয়ার এবং তার ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে তার ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের কঠিন পরিণতির কথা জানানো হয়েছে।

২. সম্পদ ও উপার্জন তাকে রক্ষা করতে পারবে না

আবু লাহাব তার সম্পদ ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে অহংকার করত। সূরায় বলা হয়েছে, তার সম্পদ এবং সে যা অর্জন করেছে তা তার কোনো কাজে আসবে না।

এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে আল্লাহর অবাধ্য হলে মানুষের ধন-সম্পদ, ক্ষমতা বা সামাজিক মর্যাদা তাকে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারে না।

৩. জাহান্নামের আগুনের শাস্তির কথা বলা হয়েছে

সূরায় আবু লাহাবের পরিণতি হিসেবে প্রজ্বলিত আগুনে প্রবেশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এটি তার অবিশ্বাস ও সত্যের বিরোধিতার শাস্তি সম্পর্কে কঠোর সতর্কবার্তা।

৪. আবু লাহাবের স্ত্রীর ভূমিকা উল্লেখ করা হয়েছে

সূরায় আবু লাহাবের স্ত্রীকেও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিরোধিতায় তার স্বামীকে সহযোগিতা করতেন এবং ইসলামের দাওয়াতের পথে বিভিন্নভাবে বাধা সৃষ্টি করতেন।

৫. ‘কাঠ বহনকারী’ হিসেবে তার উল্লেখ

আবু লাহাবের স্ত্রীকে ‘কাঠ বহনকারী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাফসিরকারদের ব্যাখ্যায় এর সঙ্গে তার রাসুল (সা.)-এর পথে কাঁটা বা ক্ষতিকর বস্তু রাখার ঘটনা এবং মানুষের মধ্যে শত্রুতা ও অপবাদ ছড়ানোর অর্থের সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়েছে।

৬. পাকানো রশির উল্লেখ

সূরার শেষ আয়াতে তার গলায় পাকানো রশি থাকার কথা বলা হয়েছে। এটি তার শাস্তির একটি চিত্র তুলে ধরে এবং তার পরিণতির কঠোরতা প্রকাশ করে।

সূরা আল-লাহাব থেকে আমরা কী শিক্ষা পাই-

১. সত্যের বিরোধিতা করা যাবে না

২. আত্মীয়তার সম্পর্ক ঈমানের বিকল্প নয়

৩. সম্পদ নিয়ে অহংকার করা যাবে না

৪. অন্যের ভালো কাজে বাধা দেওয়া উচিত নয়

৫. অপবাদ ও গুজব থেকে বিরত থাকতে হবে

৬. অহংকার মানুষের পতনের কারণ হতে পারে

৭. আল্লাহর অবাধ্যতার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে

উপসংহার-

সূরা আল-লাহাব ছোট হলেও এর শিক্ষা অত্যন্ত গভীর। এতে আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর উদাহরণের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে যে সম্পদ, ক্ষমতা, বংশ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক মানুষকে আল্লাহর জবাবদিহি থেকে রক্ষা করতে পারে না।

এই সূরা আমাদের সত্যের পথে থাকার, অহংকার থেকে দূরে থাকার, সম্পদের সঠিক ব্যবহার করার এবং অন্যের ক্ষতি, অপবাদ ও বিদ্বেষ থেকে নিজেকে রক্ষা করার শিক্ষা দেয়।

সূরা আল-লাহাব সম্পর্কে প্রশ্ন ও উত্তর-

প্রশ্ন: সূরা আল-লাহাব কুরআনের কত নম্বর সূরা?

উত্তর: সূরা আল-লাহাব পবিত্র কুরআনের ১১১ নম্বর সূরা।

প্রশ্ন: সূরা আল-লাহাবে কয়টি আয়াত রয়েছে?

উত্তর: সূরা আল-লাহাবে মোট ৫টি আয়াত রয়েছে।

প্রশ্ন: সূরা আল-লাহাব কোথায় নাজিল হয়েছে?

উত্তর: সূরা আল-লাহাব মক্কায় নাজিল হয়েছে এবং এটি একটি মাক্কী সূরা।

প্রশ্ন: আল-লাহাব শব্দের অর্থ কী?

উত্তর: ‘আল-লাহাব’ শব্দের অর্থ হলো প্রজ্বলিত আগুনের শিখা।

প্রশ্ন: সূরা আল-লাহাবে কার কথা বলা হয়েছে?

উত্তর: সূরা আল-লাহাবে প্রধানত আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং তাদের পরিণতির কথা বলা হয়েছে।

প্রশ্ন: সূরা আল-লাহাব থেকে আমরা কী শিক্ষা পাই?

উত্তর: এই সূরা থেকে আমরা শিক্ষা পাই যে সত্যের বিরোধিতা, অহংকার, সম্পদের গর্ব এবং মানুষের ক্ষতি করার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। তাই আল্লাহর প্রতি ঈমান রেখে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে হবে।


Share this article

Leave a Reply

Back To Top