ফের ভূমিকম্প: ভূমিকা-
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, রমাদান মাসের শুক্রবার—একটি দিন যা মুসলমানদের জন্য ইবাদাত ও জুম্মার নামাযের মতো পবিত্র মুহূর্ত নিয়ে আসে, সেটি একই দিনে আচমকাই আসে একটি টেলুরিক ঘটনার শোরগোল। দুপুর ১টা ৫২ মিনিটে দেশজুড়ে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার উৎপত্তি ছিল সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার ভূ-আলয়ে। এই ভূমিকম্প অনুভূত হয় বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরসহ রাজধানী ঢাকায়ও। এই ব্লগে জানব বিস্তারিত। (ঘন ঘন ভূমিকম্প কি বার্তা দিচ্ছে বাংলাদেশকে?— ভূমিকম্প ঝুঁকি, কারণ, প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ বিশ্লেষণ)
আজকের ভূমিকম্প: সময়, মাত্রা ও উৎপত্তি-
২৭ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার দুপুর ১:৫২ মিনিটে বাংলাদেশে একটি শক্ত ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল ৫.৩-৫.৫। আবহাওয়া অধিদফতর এবং বিভিন্ন সিসমোলজিক্যাল সংগঠনের তথ্যে জানা যায়, এর উৎপত্তিস্থল সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা–তে অবস্থান করছিল এবং কম্পনটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ ঢাকাসহ অন্যান্য অঞ্চলেও স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়।
এই ভূমিকম্পের সেন্টার ছিল সাতক্ষীরা–খুলনা সীমান্তবর্তী অঞ্চল, যা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী নামাযের সময় মসজিদে অবস্থানরত বহু মুসল্লি ঐ সময় আকস্মিকভাবে কম্পন অনুভব করে আতঙ্কিত হয়ে বাইরে বের হন।
এই ভূমিকম্পের ঠিক ২ দিন আগে, অর্থাৎ ২৫ ফেব্রুয়ারি রাত ১০:৫১ মিনিটে, একটি পৃথক ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল বাংলাদেশে। এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে না-থাকলেও মায়ানমারেই উৎপত্তি হয়েছিল এবং এর ধারণকৃত মাত্রা ছিল ৫.১। সেই ভূমিকম্পটি ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য এলাকায় কম্পন অনুভূত করেছিল।
যদিও সেই রাতে কোনো বড় ধরণের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, তা ভূমিকম্পের ভূ-তত্ত্বগত কার্যক্রমে বাংলাদেশের সমস্যা-সম্ভাবনাকে তুলে ধরেছে। বেশি-দূরত্বে উৎপন্ন হলেও এটি অনুভূত হওয়া একভাবে শক্তির সংক্রমণ ও প্লেট কার্যক্রমের বহিঃপ্রকাশ।
কেন বাংলাদেশে ভূমিকম্প হয়?-
বাংলাদেশ একটি সিসমিকলি অ্যাকটিভ এলাকা, কারণ এটি ভারতীয় প্লেট ও ইউরেশিয়ান প্লেটের সংযোগ অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থান করে। এই অঞ্চলে ভূ-তত্ত্বীয় ফোল্ট লাইন এবং ভূমিকম্প-জোনরা সময়-সময় কম্পন সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে বিশেষ করে ডাউকি ফল্ট, মধুপুর ফল্ট ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু ফল্ট সক্রিয় বলে আবহাওয়া অধিদফতর ও গবেষকরা মনে করেন।
সাতক্ষীরায় যেই ভূমিকম্পটি ঘটেছে তা তুলনামূলকভাবে মধ্য-শক্তির ভূমিকম্প (৫-এর ওপরে), যার জন্য কম্পন তাৎক্ষণিকভাবে অনুভূত হলেও সাধারণত বড় ধ্বংস সৃষ্টি করে না, তবে সতর্ক থাকা জরুরি।
ভূ-তত্ত্বীয় প্রেক্ষাপট: ফোল্ট লাইন ও প্লেট গতিবিধি-
বাংলাদেশের ভূ-তত্ত্বীয় পরিবেশে বেশ কিছু ফল্ট লাইন রয়েছে যেগুলি গতি সৃষ্টি করে বলে মনে করা হয়। ডাউকি ফল্ট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্লেট সংযোগ সাইট হিসেবে বিবেচিত হয়, যেখানে ভারতীয় ও ইউরেশিয়ান প্লেট সংঘর্ষের কারণে চাপ সৃষ্টি হয়। যদিও ডাউকি ফল্ট মূলত পূর্ববাংলা ও সিলেট অঞ্চলে অবস্থিত, কিন্তু পশ্চিমা অঞ্চলের ফল্টেও কম্পন হতে দেখা গেছে।
ফল্ট লাইনগুলোতে চাপ জমা হলে সেই শক্তি হঠাৎ ছুড়ে কম্পন তৈরি করে। এই কম্পন যখন পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠে পৌঁছায়, আমরা সেটিকে ভূমিকম্প হিসেবে অনুভব করি। আর বাংলাদেশের নিচের মাটির বিশেষ গঠন এই কম্পনকে লম্বা সময় অনুভূত করার কারণেও ভূমিকা রাখে।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে ঘন ঘন ভূমিকম্প হওয়ার কারণ-
কুরআনে ভূমিকম্প সম্পর্কে আলোচনা:
সূরা আয-যালযালাহ (سورة الزلزلة)
সূরা আয-যালযালাহ-এ আল্লাহ তাআলা বলেন:
“যখন পৃথিবী তার প্রচণ্ড কম্পনে প্রকম্পিত হবে,
এবং পৃথিবী তার বোঝা বের করে দেবে…” (৯৯:১-২)
এই আয়াতে কিয়ামতের দিনের ভয়াবহ ভূমিকম্পের কথা বলা হয়েছে। আলেমদের মতে, এটি এমন এক কম্পন হবে যা মানবজাতি আগে কখনো দেখেনি। এটি কেবল একটি ভূমিকম্প নয়, বরং চূড়ান্ত বিচারের সূচনা।
সূরা আল-হাজ্জ
সূরা আল-হাজ্জ-এ বলা হয়েছে:
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো। নিশ্চয় কিয়ামতের কম্পন এক ভয়ংকর বিষয়।” (২২:১)
এখানে ভূমিকম্পকে কিয়ামতের বড় নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি মানুষের অন্তরে তাকওয়া ও আল্লাহভীতি জাগ্রত করার জন্য সতর্কবার্তা।
পূর্ববর্তী জাতিদের উপর শাস্তি হিসেবে ভূমিকম্প:
কুরআনে উল্লেখ আছে যে কিছু জাতির উপর ভূমিকম্প শাস্তি হিসেবে নাজিল হয়েছিল।
উদাহরণস্বরূপ, সূরা আল-আ’রাফ-এ বর্ণিত আছে যে, হযরত শুয়াইব (আ.)-এর কওম অবাধ্যতার কারণে ভয়াবহ কম্পনে ধ্বংস হয়েছিল।
এতে বোঝা যায়—ভূমিকম্প কখনো কখনো আল্লাহর শাস্তির মাধ্যমও হতে পারে।
হাদীসে ভূমিকম্প সম্পর্কে কী বলা হয়েছে?-
কিয়ামতের পূর্বলক্ষণ হিসেবে ভূমিকম্প:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না অধিক পরিমাণে ভূমিকম্প দেখা দেয়।”
— সহিহ বুখারি
এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, বারবার ভূমিকম্প হওয়া কিয়ামতের নিকটবর্তী হওয়ার অন্যতম আলামত।
গুনাহ বৃদ্ধি পেলে ভূমিকম্প:
আরেক হাদীসে এসেছে:
“আমার উম্মতের মধ্যে যখন গান-বাজনা, ব্যভিচার ও মদ্যপান ব্যাপক হবে, তখন আল্লাহ তাদের উপর ভূমিকম্প ও ভূমিধস পাঠাবেন।”
— সুনান ইবনে মাজাহ
এই হাদীসটি আমাদের সতর্ক করে যে, সমাজে অন্যায় ও পাপাচার বেড়ে গেলে আল্লাহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাধ্যমে সতর্ক করতে পারেন।
তাহলে বারবার ভূমিকম্পের মানে কী?-
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ভূমিকম্প তিনভাবে দেখা যেতে পারে—
- আল্লাহর নিদর্শন (আয়াত)-আল্লাহ তাঁর শক্তি ও ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য প্রাকৃতিক ঘটনা ঘটান।
- সতর্কবার্তা- মানুষকে তওবা ও আত্মসমালোচনার দিকে ফিরিয়ে আনার মাধ্যম।
- কিয়ামতের স্মরণ- প্রতিটি ভূমিকম্প মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—একদিন চূড়ান্ত কম্পন আসবেই।
প্রশ্ন ও উত্তর-
আজকের ভূমিকম্প কোথায় উৎপন্ন হয়েছিল?
আজকের ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা।
ভূমিকম্পটি কত মাত্রার ছিল?
ভূমিকম্পটি ৫.৩-৫.৫ রিখটার স্কেলে ছিল।
এরকম ভূমিকম্প কেন হয়?
উপরের প্লেটের গতি ও ফল্ট লাইনের চাপের কারণে ভূমিকম্প হয়। বাংলাদেশ ভারতীয় ও ইউরেশিয়ান প্লেটের সংযোগ অঞ্চলে হওয়ায় এটি বেশি কম্পনের ঝুঁকিতে থাকে।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে কোন ভূমিকম্প হয়েছিল?
২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে একটি মায়ানমার উৎসভূমিকম্প ছিল, যার মাত্রা ছিল ৫.১ এবং কম্পন ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় অনুভূত হয়েছিল।
কি ক্ষতি হয়েছে?
প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, আজকের ভূমিকম্পে বড় কোনো ধ্বংস বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে আবহাওয়া অধিদফতর ও সিসমোলজিক্যাল সংস্থা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখেছে।














