দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি: ভূমিকা-
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি একটি তীব্র অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে পবিত্র রমাদানের সময়, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম আগের তুলনায় তুলনাহীনভাবে বেড়ে যাওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের জীবন কষ্টকর হয়ে ওঠে। এই ব্লগে আমরা মূল্যস্ফীতির প্রকৃত কারণ, পরিসংখ্যান, রমাদানের বাজারের চাপ এবং এর ফলে ভোক্তাদের যে ভোগান্তি হচ্ছে তা বিশদভাবে বর্ণনা করব।
দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতির বর্তমান বাস্তবতা-
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্য অনুযায়ী ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮.৫৮% এ পৌঁছেছে, যা গত বছরের তুলনায় উদ্বেগজনক উচ্চ পর্যায়। বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যস্ফীতি উচ্চ অবস্থানেই রয়েছে — জানুয়ারিতে খাদ্য খাতের মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮.২৯%, যা ডিসেম্বরে ছিল ৭.৭১%। এ পরিস্থিতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস যেমন সবজি, মাংস, মুরগি, ফলমূল এবং অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের দাম সাধারণ পরিবারের আয়কে পুরোপুরি চাপের মধ্যে ফেলেছে।
রমাদানে পণ্যের উর্দ্ধগতির অবস্থা-
অন্যান্য দেশগুলোর দিকে যদি মনোযোগ দেওয়া হয় তবে দেখা যাবে যে রমাদানের সময় নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রর্ব্যমূল্যের দাম কমিয়ে দেয় জনগণের জন্য কিন্তু আমাদের দেশ মুসলিম প্রধান দেশ হয়েও তারা রমাদানকে বেছে নেয় তাদের ব্যবসায়তে প্রচুর মুনাফার সুযোগ হিসেবে। সাধারণ দিন অপেক্ষা তারা নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি করে। এতে করে মানুষের উপর যে জুলুম তারা করে রমাদানে তাতে তাদের কোনো অনুশোচনা আসেনা। মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতি রমাদানে এহেন আচরণ আমাদের দেশে ক্রমাগত চলে আসছে। আমরা জানিনা সামাজিক ও ইসলামিক নৈতিক মূল্যবোধ কবে জাগ্রত হবে এই দেশে?? কবে এ দেশে জুলুম বন্ধ হবে??
রমাদানে পণ্যের দাম বাড়ার কারণ-
১. চাহিদা ও সরবরাহের অমিল-
রমাদানে মানুষের খাদ্য চাহিদা স্বাভাবিক মাসের তুলনায় বেড়ে যায়, বিশেষ করে ইফতার ও সহরি সময় বেশি পরিমাণে খাবার প্রস্তুত হয়। এই চাহিদা বৃদ্ধির সময় বাজারে সরবরাহ ঠিক মাত্রায় না বাড়ার কারণে দাম বাড়তে থাকে।
২. মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব-
অনেকে মনে করেন, বাজারে দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পেছনে মধ্যস্বত্বভোগীরা অসামঞ্জস্যমূলক কাজে জড়িত — তাদের কৃত্রিম অপর্যাপ্ত সরবরাহ ও অপ্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দামের কারণে সাধারণ ভোক্তা প্রতিকূল অবস্থায় পড়ে।
৩. আন্তর্জাতিক মূল্যের ধারা ও আমদানি-
বিশ্ববাজারে খাদ্য উপকরণ ও জ্বালানি মূল্যের ওঠানামা সরাসরি বাংলাদেশে আমদানি মূল্যকে প্রভাবিত করে। যদিও ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে কিছু মূল্যের পতন দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে সেই পতন বাজারে খুব একটা প্রতিফলিত হচ্ছে না।
রমাদানে বাজার পরিস্থিতি উদাহরণ-
রমাদানের শুরুতেই রাজধানী ঢাকার বাজারগুলোতে সবজি, মাংস, মুরগি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম আগের মাসের তুলনায় বেড়ে গেছে। কাঁচা সবজির দাম এমনকি কেজির ১০০ থেকে ১৪০ টাকার মধ্যেই বিক্রি হচ্ছে। এমনকি লেবু যে জায়গায় রমাদানের আগে ২০ টাকা হালি বেঁচা হতো সেটা রমাদানে ১৪০, ১২০ টাকা হালিতে এসে পৌছেছে। বেগুনের দামও পিছিয়ে নেই।
এমন পরিস্থিতি অনেক মধ্য ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে দৈনন্দিন ক্রয়ের সিদ্ধান্ত কঠিন করে তুলেছে। কিছু ক্ষেত্রে ভোক্তা জানিয়েছেন, দাম বাড়ার কারণে তাদের ঘরের বাজেট কঠিন সীমায় পৌঁছেছে।
সাধারণ মানুষের ভোগান্তি-
১. আয় ও ব্যয়ের অসমতা-
বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেক পরিবারের আয় বাড়ছে না, কিন্তু দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি ত্বরান্বিত হচ্ছে — এর ফলে Hausholder-দের খরচ বাড়ছে এবং নানা খাতে কাটছাঁট করতে হচ্ছে।
২. ব্যয় বেড়ে যাওয়া-
খাবার, গ্যাস, বিদ্যুৎ, প্রয়োজনীয় উপকরণ ইত্যাদি সবকিছুর দাম বাড়ার ফলে মানুষের মাসিক ব্যয় বেড়ে গেছে। কিছু পরিবার বাধ্য হয়ে ঋণ নিচ্ছে বা অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে দিচ্ছে।
৩. মানসিক ও সামাজিক চাপ-
দাম বাড়ার ফলে সামাজিক ও মানসিক চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে। উপার্জনের তুলনায় ব্যয়ের বড় পার্থক্য মানুষকে হতাশায় ফেলছে এবং পরিবারিক সিদ্ধান্তগুলো কঠিন করে তুলছে।
সরকারের পদক্ষেপ ও বাজার নিয়ন্ত্রণ-
সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে যাতে খাদ্যদ্রব্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে:
- আমদানি-সম্পর্কিত শুল্ক ও এলসি (Letter of Credit) শর্ত সহজীকরণ যাতে আমদানিকে বাড়ানো যায়।
- ট্রেডিং করপোরেশন অফ বাংলাদেশ (TCB)-এর মাধ্যমে বাজারে কম দামে পণ্য বিক্রয়।
এ উদ্যোগগুলোর লক্ষ্য হলো খাদ্য সরবরাহ বাড়ানো এবং বাজারে মূল্য স্থিতিশীল রাখা।
তবে কঠিন বাস্তবতা এটাই যে সরকার সঠিকভাবে পদক্ষপ নিলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যেত তবে বেশিরভাব দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরা অসাধু ব্যবসায়ীদের সাথে জড়িত তাই বাজারের মূল্যের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই বলে লাগামহীনভাবে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ছে আর সেটা রমাদানে আরও চরম হয়ে উঠছে সাধারণ জনগণের জন্য বিশেষ করে নিম্নশ্রেণী আয়ের জনগণের জন্য।
দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি রোধে করণীয়-
১. বাজার তদারকি জোরদার-
ত্রৈমাসিক বাজার মনিটরিং ও দাম নিয়ন্ত্রণ কমিটি আরও কার্যকরভাবে কাজ করলে বাজারে অযথা মূল্যবৃদ্ধি কম হবে।
২. স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো-
কৃষি ও উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো হলে দেশীয় বাজারে খাদ্য সরবরাহ বাড়বে এবং আমদানি‐নির্ভরতা কমে যাবে।
৩. সরবরাহ শৃঙ্খলার উন্নয়ন-
হোল্ডিং, সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে কম খরচে পণ্য বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
উপসংহার-
বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয় — এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, পরিবারিক বাজেট এবং মানসিক অবস্থার উপর গভীর প্রভাব ফেলছে। রমাদানের মতো বিশেষ মাসে এই চাপ আরও বাড়ে, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষজনের জন্য এটি একটি বড় ধরনের অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়ায়। সরকারের উদ্যোগ, বাজার তদারকি, এবং সাধারণ মানুষের সচেতন অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন-
দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি কী এবং কেন এটি ঘটছে?
– এটি হলো দ্রব্যদ্রব্যের মূল্য ধারাবাহিকভাবে বেড়ে যাওয়ার অবস্থা, যা মুদ্রাস্ফীতি, চাহিদা-সরবরাহের বৈষম্য ও বাজার ব্যবস্থার অপ্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরিস্থিতির কারণে ঘটে থাকে।
রমাদানে মূল্য বৃদ্ধি স্বাভাবিক কি?
-কিছু পরিমাণ দাম বাড়া স্বাভাবিক কারণ চাহিদা বাড়ে, তবে উচ্চহারে বৃদ্ধি অবশ্যই বাজারের অস্থিরতা ও অন্যান্য কারণে ঘটে থাকে।
সাধারণ মানুষ কি ভাবে এই পরিস্থিতিতে উপায় করতে পারে?
– বাজেট পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী কেনাকাটা, এবং স্থানীয় উৎপাদিত পণ্য বেছে নেওয়া মানুষের জন্য সহায়ক হতে পারে।
সরকার মূল্য নিয়ন্ত্রণে কি উদ্যোগ নিচ্ছে?
– আমদানি সহজ করা, TCB-এর মাধ্যমে কম দামে পণ্য সরবরাহ, এবং বাজার তদারকি উদ্যোগ এর মধ্যে রয়েছে। যদি সঠিকভাবে কাজ করা হয় তবে মূল্য নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।














