প্রাকৃতিক গ্যাস সংকট ও সিলিন্ডার গ্যাসের সিন্ডিকেট- নিত্যদিনের এক অসহ্য বাস্তবতা-
আজকের বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্য হলো—চুলায় হাঁড়ি বসানো, কিন্তু আগুন জ্বলছে না। চুলায় আগুন নেই, প্রাকৃতিক গ্যাস তো নেই উপরন্তু সিলিন্ডার গ্যাসের সিন্ডিকেট—এই একটি বাক্যেই যেন লাখো পরিবারের দৈনন্দিন কষ্টের গল্প লুকিয়ে আছে। রান্না করা এখন শুধু সময়সাপেক্ষ নয়, বরং মানসিক চাপের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এলপিজি গ্যাসের দাম সরকারি ভাবে নির্ধারণ করায় মূলত বাংলাদেশে এখন এর সিন্ডিকেট চলছে, সাড়ে ১২শ টাকার সিলিন্ডার মিলছে দেড় গুণ বেশি দামে। এমনকি ৩০০০ টাকা বলেও মিলছে না এলপি গ্যাস। তীব্র গ্যাস সংকট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব এই বল্গে।
প্রাকৃতিক গ্যাস সংকট: সমস্যার শুরু যেখান থেকে-
একসময় শহর ও শহরতলির ঘরে ঘরে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংযোগ ছিল। নিরবচ্ছিন্ন না হলেও মানুষ অন্তত রান্নার নিশ্চয়তা পেত। কিন্তু ধীরে ধীরে নতুন সংযোগ বন্ধ, পুরোনো লাইনে চাপ কমে যাওয়া এবং সরবরাহ ঘাটতির কারণে প্রাকৃতিক গ্যাস তো নেই—এটাই আজকের বাস্তবতা। অনেক এলাকায় দিনে কয়েক ঘণ্টাও গ্যাস থাকে না, কোথাও আবার দিনের পর দিন চুলা ঠান্ডা।
এলপিজির দিকে ঝোঁক, কিন্তু সেখানেও বিপত্তি-
প্রাকৃতিক গ্যাসের অভাবে মানুষ বাধ্য হয়ে এলপিজি বা সিলিন্ডার গ্যাসের দিকে ঝুঁকেছে। কিন্তু এখানেই শুরু হয়েছে নতুন সংকট। এই সিন্ডিকেটই এখন ভোক্তার সবচেয়ে বড় শত্রু। নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন কোম্পানি ও ডিলার নিজেদের মতো করে দাম বাড়াচ্ছে। তাদের ভাষ্যমতে বিশ্ববাজারে জাহাজ সংকটের কারণে আমদানিতে প্রভাব পড়ছে এবং এলপিজির সরবরাহ কম থাকায় বাড়ছে এর মূল্য। তবে এই কথা ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক আখ্যা দিচ্ছেন কনজিউমার্ অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ ক্যাম্প।
সিলিন্ডার গ্যাসের সিন্ডিকেট কীভাবে কাজ করে-
সিন্ডিকেট মূলত কিছু আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতার অদৃশ্য জোট। সরকার বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা দাম নির্ধারণ করলেও বাস্তবে তা মানা হয় না। সংকট তৈরি করে কৃত্রিমভাবে সরবরাহ কমানো হয়, ফলে দাম বাড়ে। সাধারণ মানুষ তখন বাধ্য হয়ে বাড়তি দামেই গ্যাস কিনতে বাধ্য হয়।
এলপিজির দাম বৃদ্ধির ভয়াবহ প্রভাব-
একটি পরিবারের মাসিক বাজেটে রান্নার গ্যাস এখন বড় খরচের খাত। আগে যেখানে ৮০০–৯০০ টাকায় একটি সিলিন্ডার মিলত, সেখানে এখন তা ১৩০০–১৫০০ টাকা বা তারও বেশি। এই পরিস্থিতিতে নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সম্প্রতি ২৫০০, ২৬০০ আবার কোথা্ও ৩০০০ টাকাতেও মিলছে না এই গ্যাস। এখন সরকারের এই বিষয়ে কঠিন পদক্ষেপ নেয়া জরুরী।
রান্নাঘরের সংকট থেকে সামাজিক সংকট-
রান্না করতে না পারা শুধু একটি ঘরের সমস্যা নয়, এটি সামাজিক সমস্যায় রূপ নিচ্ছে। অনেক পরিবার দিনে একবার রান্না করছে, কোথাও আবার বাইরে থেকে খাবার কিনতে বাধ্য হচ্ছে। এতে পুষ্টিহীনতা বাড়ছে, শিশু ও বৃদ্ধদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
নারীদের ওপর বাড়তি চাপ-
এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী নারীরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুলার সামনে বসে থাকা, কখন গ্যাস আসবে সেই অপেক্ষা, আবার কখন শেষ হবে সেই ভয়—সব মিলিয়ে মানসিক চাপ চরমে পৌঁছেছে। নারীর দৈনন্দিন জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের দুর্ভোগ-
শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষ সময়মতো খাবার না পেয়ে পড়াশোনা ও কাজে মনোযোগ হারাচ্ছে। সকালের নাশতা কিংবা দুপুরের খাবার প্রস্তুত করতে না পেরে অনেকেই অস্বাস্থ্যকর বিকল্পের দিকে ঝুঁকছে।
সরকার কি জানে না এই বাস্তবতা?-
প্রশ্ন ওঠে—সরকার কি এই সংকট জানে না? নিশ্চয়ই জানে। কিন্তু কার্যকর তদারকি ও সিন্ডিকেট ভাঙার উদ্যোগ না থাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। চুলায় আগুন নেই, প্রাকৃতিক গ্যাস তো নেই উপরন্তু সিলিন্ডার গ্যাসের সিন্ডিকেট—এই অভিযোগ আজ সর্বস্তরের মানুষের মুখে মুখে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা কতটা কার্যকর-
বিইআরসি বা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিয়মিত দাম ঘোষণা করলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রয়োগ খুব কম দেখা যায়। ভোক্তাদের অভিযোগ জানানোর পথ থাকলেও দ্রুত সমাধান পাওয়া যায় না।
বিকল্প জ্বালানির সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা-
ইলেকট্রিক চুলা, ইনডাকশন কুকার কিংবা বায়োগ্যাস—এসব বিকল্প নিয়ে আলোচনা হলেও বাস্তবে সবার জন্য তা সহজ নয়। বিদ্যুতের দাম ও লোডশেডিংয়ের কারণে এসব সমাধান সীমিত। ফলে মানুষ আবারও ফিরে আসে সেই একই সমস্যায়।
গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা-
গ্যাসের অপচয় রোধ, বিকল্প রান্না পদ্ধতি, এবং ভোক্তা অধিকার সংস্থায় অভিযোগ জানানো কিছুটা হলেও সহায়ক হতে পারে। গ্যাস সংকট ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমের সোচ্চার ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। নাগরিক সমাজের চাপ ছাড়া এই অদৃশ্য শক্তিকে ভাঙা কঠিন।
সমাধানের পথ কোথায়???-
দীর্ঘমেয়াদে প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান বৃদ্ধি, এলপিজি আমদানি ও বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, এবং কঠোর মনিটরিংই পারে এই সংকট থেকে মুক্তি দিতে। নইলে এই হাহাকার চলতেই থাকবে।
প্রশ্নোত্তর-
১. চুলায় আগুন নেই কেন?
প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি ও এলপিজি সরবরাহ সংকটের কারণে অনেক এলাকায় চুলায় আগুন নেই।
২. সিলিন্ডার গ্যাসের দাম এত বেশি কেন?
মূল কারণ হলো সিলিন্ডার গ্যাসের সিন্ডিকেট, যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ায়।
৩. সরকার কি এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণ করে না?
সরকার দাম নির্ধারণ করে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে তদারকির অভাবে তা পুরোপুরি কার্যকর হয় না।
৪. এই সংকট থেকে মুক্তির উপায় কী?
সিন্ডিকেট ভাঙা, কঠোর মনিটরিং, বিকল্প জ্বালানি উন্নয়ন এবং স্বচ্ছ বাজার ব্যবস্থাপনাই প্রধান সমাধান।

