কাবুলে বিস্ফোরণের দায় স্বীকার: ঘটনা, কারণ ও বিশ্লেষণ-
২০২৬ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে একটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটেছে, যেখানে একটি চীনা রেস্তোরাঁতে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানো হয় এবং এতে কমপক্ষে সাতজন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হন। এই বিস্ফোরণের দায় স্বীকার করেছে ইসলামিক স্টেট (Islamic State) এর আফগান শাখা।
এই বিস্তৃত ব্লগটিতে আমরা বিশ্লেষণ করবো—কি ঘটেছে, কেন ঘটেছে, ইসলামিক স্টেট কি বলেছে, এবং এর পেছনে কোন শক্তি কাজ করছে কিনা??
কাবুল বিস্ফোরণের ঘটনা কী?-
২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি কাবুলের একটি চীনা রেস্তোরাঁয় বিস্ফোরণ ঘটে, যেখানে বসতি ছিল সুরক্ষিত শহর কেন্দ্রের শাহর-ই-নাও এলাকায়। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, এটি একটি আত্মঘাতী বোমাবাজ দ্বারা পরিচালিত বিস্ফোরণ ছিল, এবং এতে অন্তত এক চীনা নাগরিক ও ছয়জন আফগান নাগরিক নিহত হয়েছেন, এবং আহত হয়েছেন আরো অনেকে, যার মধ্যে এমনকি একটি শিশু রয়েছে।
এই চাইনিজ রেস্তোরাঁটি আব্দুল মজিদ নামের এক চীনা মুসলিম, তার স্ত্রী ও আব্দুল জব্বার মাহমুদ নামের এক আফগান অংশীদার যৌথভাবে পরিচালনা করতেন। যেখানে স্থানীয় ও বিদেশি—বিশেষ করে চীনা মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যরা নিয়মিত আসতেন।
চীনের উইঘুর নীতি ও আইএসের দাবির প্রেক্ষাপট-
ইসলামিক স্টেট দাবি করেছে যে, এটি ছিল উইঘুর মুসলিমদের ওপর চাপ ও নির্যাতনের প্রতিবাদে একটি প্রতিক্রিয়ার অংশ। উইঘুররা মূলত চীনের ক্সিনজিয়াং অঞ্চলের একটি সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়, যেখানে চীনা সরকারের বিরুদ্ধে অন্তরীণ নীতির কারণে মানবাধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সমালোচনা রয়েছে। আইএস তাদের বক্তব্যের মাধ্যমে এটিকে একটি “ধর্মীয় আন্দোলন” হিসেবে উপস্থাপন করলেও বাস্তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই সংযোগ ও দায় দাবির সম্পর্কে অনেকেই সন্দিহান। সত্য যে চীনা নীতি ও উইঘুরদের অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনা চলছে, কিন্তু কি ক্ষেত্রে এটা এই হামলার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত তা স্পষ্ট নয়।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আফগানিস্তানের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ-
কাবুলে এত সীমিত সময়ের মধ্যে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটলেও আফগানিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দীর্ঘ সময় ধরে চ্যালেঞ্জের মুখে। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে ইসলামিক স্টেটের মত বিরোধী জঙ্গি সংগঠনগুলো আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বহু ফাঁক দেখা গেছে। এই পটভূমিতে ঘটেছে এই বিস্ফোরণ।
পশ্চিমা শক্তি ও কূটনৈতিক ব্যস্ততা-
এই হামলার পেছনে পশ্চিমা শক্তি কাজ করেছে কি না — এমন একটি প্রশ্নও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উঠেছে। এখন পর্যন্ত কোনো শক্তি স্পষ্টভাবে এই হামলার পেছনে থাকার দাবি করেনি বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, আফগানিস্তানের পরিস্থিতি নানাবিধ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক কাঠামোর প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে থাকে, যা হতাশা এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি করে।
এই সব জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এককভাবে কোন শক্তির দায় আছে বলাটা কঠিন, কিন্তু আন্তর্জাতিক মনিটরিং ও তদন্ত আরও প্রয়োজন।
ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা: ইসলামিক স্টেট-এর কণ্ঠস্বর কি সত্যিই ভিত্তিপ্রাপ্ত?
যদিও ইসলামিক স্টেট দাবি করেছে যে, তাদের এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল উইঘুর মুসলিমদের পক্ষে প্রতিবাদ, অনেক বিশ্লেষক সেই দাবিকে Propaganda বা প্রচারের মতো হিসেবে দেখছেন।
এই গোষ্ঠী ঐতিহাসিকভাবে নিজের কার্যকলাপকে বিভিন্ন ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কারণে জড়িত করেছেন, তবে বাস্তবে এর পেছনে ভিন্ন উদ্দেশ্য, সন্ত্রাসী অভিমুখ ও নিজস্ব আগ্রহ থাকতে পারে। ISIS-এর মূল লক্ষ্য হিংসা ও দমনে সহিংস কর্মসূচি চালানো; তাই তারা প্রায়ই বিপুল জনসমর্থন ছাড়াই হামলা চালায়।
সুতরাং, আপনি যদি ভাবেন যে “কাবুলে বিস্ফোরণের দায় স্বীকার” কথাটি শুধু ধর্মীয় বা নৈতিক প্রতিবাদের প্রতীক”, তাহলে তা যথেষ্ট সন্দেহজনক ও একপাক্ষিক ব্যাখ্যা হবে।
চীনার প্রতিক্রিয়া-
উইঘুররা চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল শিনজিয়াংয়ের একটি সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়। সেখানে উইঘুর জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় এক কোটি। বেইজিং সেখানে উইঘুরদের ওপর বিভিন্ন ধরনের নিগ্রহ চালাচ্ছে বলে অভিযোগ পশ্চিমা মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর।
কিন্তু বেইজিং নিগ্রহ চালানোর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, পশ্চিমা দেশগুলো সেখানে হস্তক্ষেপ করছে আর ‘অসার মিথ্যা’ ছড়াচ্ছে। চীনের সরকার এই হামলা কঠোরভাবে নিন্দা করেছে। আফগান সরকারের প্রতি তাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আহ্বান জানিয়েছে। এছাড়া আফগান তালেবান সরকারও এই ধরণের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং হত্যাকারীদের দমন করার জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে।
শেষ কথাঃ নিরাপত্তা ও সত্য অনুসন্ধান-
“কাবুলে বিস্ফোরণের দায় স্বীকার”—এই ঘটনা শুধু একটি সন্ত্রাসী হামলা নয়; এটি আফগানিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক চাপ, ধর্মীয় মতাদর্শ ও সামরিক তৎপরতার একটি প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
পরবর্তী সময়ে এই ঘটনার পেছনের বিস্তারিত তদন্ত, কোন শক্তি বা কারণের সক্রিয় ভূমিকা ছিল কি না — তা আন্তর্জাতিক তদন্ত ও নিরপেক্ষ পত্রিকার রিপোর্টিং এর মাধ্যমে জানতে পারা যাবে।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন-
১. কাবুলে বিস্ফোরণের দায় স্বীকার কি সত্যিই ইসলামিক স্টেট করেছে?
হ্যাঁ, ইসলামিক স্টেট (ISIS) এর আফগান শাখা এই বিস্ফোরণের দায় স্বীকার করেছে এবং তাদের নিজস্ব মাধ্যমের মাধ্যমে এক আত্মঘাতী বোমাবাজের মাধ্যমে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে। তবে এটি কতটুক সঠিক সেটা সুষ্ঠু তদন্ত করলে পাওয়া যাবে।
২. এই হামলার পেছনের আসল কারণ কী?
আইএস দাবি করেছে যে, এটি চীনা সরকারের বিরুদ্ধে উইঘুর মুসলিমদের প্রতি সহিংস নীতির প্রতিবাদ হিসেবে করা হয়েছে।
৩. হামলায় কয়জন নিহত ও আহত হয়েছেন?
প্রাথমিকভাবে অন্তত সাতজন নিহত (একজন চীনা নাগরিক সহ) এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজন শিশু রয়েছে।
৪. আফগান সরকারের বিরুদ্ধে কি আন্তর্জাতিক চাপ আছে?
চীনা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সরকার আফগান কর্তৃপক্ষকে তাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা প্রদান করার এবং সন্ত্রাসীদের দমন করার আহ্বান জানিয়েছে।
৫. পশ্চিমা শক্তির কোনও ভূমিকা আছে কি?
এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী সরাসরি কোনো পশ্চিমা শক্তির ভূমিকা প্রমাণিত হয়নি, তবে এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির শতকরা বিশ্লেষণে বিভিন্ন সন্দেহ ও আলোচনা তৈরি করেছে।

