কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড: এক বিকেলের আগুনে হাজারো মানুষের কান্না-
ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত কড়াইল বস্তি— যেখানে প্রায় তিন লক্ষাধিক মানুষ দিনমজুর, হকার, রিকশাচালক, গৃহকর্মী থেকে শুরু করে অসংখ্য নিম্ন আয়ের মানুষ জীবনযাপন করে। এই বস্তি বরাবরই অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে থাকে, কারণ এখানে ঘরগুলো টিন, কাঠ ও প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি; রাস্তা সংকীর্ণ, উপরিভাগে ঝুলে থাকা তারের জট এবং এলাকা জুড়ে দাহ্যবস্তু।
২৫ নভেম্বর ২০২৫, মঙ্গলবার বিকেল ৫:২২ মিনিটে শুরু হওয়া আগুন আবারও সেই ভয়াবহতার দৃশ্যকে চোখের সামনে হাজির করেছে। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন পুরো বস্তিতে ছড়িয়ে পড়ে, আর রাতভর ছটফট করতে থাকে অসহায় মানুষজন। টানা ১৬ ঘণ্টার লড়াইয়ের পর বুধবার সকালে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু তখন পর্যন্ত পুড়ে ছাই হয়ে গেছে শত শত ঘর, আর অগণিত পরিবার হারিয়েছে তাদের জীবনভর সঞ্চয়।
এই ব্লগে ঘটনার শুরু থেকে উদ্ধার, ক্ষয়ক্ষতি, কারণ, প্রভাব এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা— সবকিছুই বিশদভাবে তুলে ধরা হলো। (ঘন ঘন ভূমিকম্প কি বার্তা দিচ্ছে বাংলাদেশকে?— ভূমিকম্প ঝুঁকি, কারণ, প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ বিশ্লেষণ)
আগুনের সূত্রপাত: ২৫ নভেম্বর ২০২৫, বিকেল ৫:২২ মিনিট-
মঙ্গলবার বিকেল। করাইল বস্তি তখনও ব্যস্ত জীবন নিয়ে সরব। কেউ কাজে ফিরছেন, কেউ রাতের খাবার প্রস্তুত করছেন, কেউ আবার তুচ্ছ কোনও কাজ সারছেন। ঠিক সেই সময় বিকেল ৫:২২ মিনিটে বস্তির দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়।
প্রথমে অনেকে ভাবেন— কোনো স্টোভ বা গ্যাস সিলিন্ডারের ছোটখাটো বিস্ফোরণ হবে। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই আগুনের শিখা আকাশমুখী হয়ে ওঠে। কারণ চারপাশেই ছিল দাহ্য দ্রব্য, কাঠের তৈরি ঘর, টিনের ছাউনি, কাগজ-প্লাস্টিক, এবং ঘনবসতির কারণে বাতাসের সাথে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া শিখা।
সেই মুহূর্তে আতঙ্কে মানুষ দৌড়াতে শুরু করে। কেউ পানি ঢালতে যায়, কেউ শিশুদের নিয়ে ঘর ছাড়ে; কিন্তু আগুনের গতি ছিল এতটাই দ্রুত যে অনেকেই কিছুই উদ্ধার করতে পারেননি।
বস্তির ভেতরের পরিস্থিতি: আতঙ্ক, কান্না আর অসহায়ত্ব-
কড়াইল বস্তির মানুষ সাধারণত নিম্ন আয়ের, দিন এনে দিন খাওয়া। তাদের ঘরবাড়ি মানেই তাদের একমাত্র আশা- যেখানে থাকে কাপড়, খাবার, কিছু টাকা, চাল, ডাল, ও নথিপত্র। আগুন লাগার পরপরই মানুষ চিৎকার করতে থাকে—
- “আমার বাচ্চাটাকে বাঁচাও!”
- “মাথা গোঁজার ঠাঁইটা শেষ হয়ে গেল।”
- “সব পুড়ে গেল, মোনাজাত ছাড়া আর কিছুর ভরসা নাই।”
ধোঁয়ার তীব্রতা বাড়তে থাকায় শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের পরিস্থিতি ছিল ভয়ংকর। অনেকে ঘর থেকে বের হতে পারেননি, কারণ পথ এতটাই সংকীর্ণ যে দুই-তিনজন পাশাপাশি দৌঁড়াতেও পারছে না।
অনেক নারী তাদের ঘরের কাগজপত্র, বাচ্চাদের বই, সঞ্চয়ের সামান্য টাকা রক্ষা করতে পারেননি। আগুনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে অনেকে বাড়ির ভেতরে থাকা জামাকাপড়ও নিয়ে বের হতে পারেননি।
ফায়ার সার্ভিসের টানা ১৬ ঘণ্টার যুদ্ধ-
ঘটনার খবর পাওয়ার পরই একের পর এক ফায়ার সার্ভিস ইউনিট ঘটনাস্থলে আসে। কিন্তু তাদের সামনে ছিল কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ:
১. সংকীর্ণ রাস্তা: বস্তির ভেতরে ফায়ার ট্রাক ঢোকাই সম্ভব নয়। এজন্য ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা হোস পাইপ কাঁধে নিয়ে দৌঁড়ে দৌঁড়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন।
২. পানির সংকট: অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এজন্য আশপাশের লেক, বালতি, ট্যাংকার— সবকিছু ব্যবহার করতে হয়।
৩. দাহ্যবস্তু বেশি থাকায় আগুন তীব্র হয়: টিন, কাঠ, প্লাস্টিক, গ্যাস সিলিন্ডার— এসব আগুনকে আরও ভয়ংকর করে তোলে।
৪. রাতের অন্ধকার: রাত বাড়ার সাথে সাথে আগুনের ভেতরে কাজ করা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তারপরও টানা প্রায় ১৬ ঘণ্টা লড়াই করে বুধবার সকালে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় ফায়ার সার্ভিস।
তাদের এই প্রচেষ্টায় শত শত পরিবার না হলেও, হাজারো মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে।
সম্ভাব্য কারণ: কীভাবে আগুন লাগল?-
অগ্নিকাণ্ডের কারণ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানা না গেলেও প্রাথমিক ধারণা কয়েকটি:
বিদ্যুতের শর্টসার্কিট- করাইল বস্তিতে অবৈধ বিদ্যুতের সংযোগ থাকা একেবারে সাধারণ বিষয়। তারের জট ও নিম্নমানের সংযোগ বারবার আগুন লাগার ঝুঁকি তৈরি করে।
গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ- অনেক ঘরে রেগুলেটরের লিকেজ বা সিলিন্ডারের ত্রুটির কারণে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
চুলা/স্টোভ- চুলার পাশে থাকা দাহ্যবস্তু থেকেও আগুন লাগতে পারে।
সরকার তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং দ্রুত কারণ উদঘাটনের দাবি তুলেছে স্থানীয়রা।
ক্ষয়ক্ষতি: যা পুড়ে গেছে-
- শতাধিক ঘর সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে
- কয়েক হাজার মানুষ নিঃস্ব হয়েছে
- বহু শিশু তাদের বই, ব্যাগ, পোশাক হারিয়েছে
- নারীরা হারিয়েছে জীবনভর সঞ্চয়
- অনেক ব্যবসা, দোকান, ছোটখাটো কর্মশালা ধ্বংস হয়েছে
- গুরুত্বপূর্ণ নথি— জন্মসনদ, এনআইডি, শিক্ষাগত সার্টিফিকেট— কিছুই রক্ষা পায়নি
করাইলের এই মানুষগুলো এখন খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে— কেউ ক্ষতিপূরণের আশায়, কেউ সাহায্যের অপেক্ষায়, কেউ আতঙ্কে কাঁপছে পরবর্তী দিনের চিন্তায়।
স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি: আগুনের পর নতুন বিপদ-
আগুনের পর বস্তি এলাকায় দেখা দিয়েছে:
- ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট
- চোখে জ্বালা
- পুড়ে যাওয়া ঘরের ধূলা থেকে অ্যালার্জি
- খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট
- শিশুদের ঠান্ডা ও জ্বর
অনেকে আশ্রয়হীন থাকায় সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এই অগ্নিকাণ্ড আমাদের কী শিখিয়েছে?-
নিরাপত্তাহীন এলাকা সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গা
যেখানে অগ্নিনিরাপত্তা নেই, সেখানে বিপদ যেকোনো মুহূর্তে আসতে পারে।
পরিকল্পিত ঘরবাড়ি না থাকলে ক্ষতি সীমাহীন হয়
ঘরগুলো যদি সঠিকভাবে নির্মাণ করা হতো, ক্ষতি এতটা হতো না।
সরকারি নজরদারি প্রয়োজন
কারণ কড়াইল বস্তিতে মানুষ নিজ উদ্যোগে নিরাপত্তা বজায় রাখা কঠিন।
পুনর্বাসন ও উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি
এই মানুষগুলো বারবার আগুনে পুড়ে নিঃস্ব হচ্ছে।
কড়াইলকে নিরাপদ করতে করণীয়-
- অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র স্থাপন
- প্রশস্ত রাস্তা তৈরি
- দাহ্যবস্তু ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ
- নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা মহড়া
- সচেতনতা বাড়ানো
- পরিকল্পিত ঘরবাড়ি নির্মাণ
- সরকারি নজরদারি বৃদ্ধি
নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে এমন ভয়াবহ আগুনের পুনরাবৃত্তি অনেকাংশে কমে যাবে।
উপসংহার: কড়াইল বস্তির আগুন— শুধু আগুন নয়, মানুষের অনুভূতির মৃত্যু-
২৫ নভেম্বর ২০২৫ কড়াইল বস্তির অগ্নিকাণ্ড ছিল শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়— এটি কয়েক হাজার মানুষের স্বপ্ন, আশা, স্মৃতি ও জীবন সংগ্রামের ওপর আঘাত। ১৬ ঘণ্টা আগুন নেভানো সম্ভব হলেও- মানুষের জীবনের ক্ষত মুছতে সময় লাগবে বহু বছর। এই আগুন আমাদের মনে করিয়ে দেয়-ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় উন্নয়ন ছাড়া নিরাপত্তা আসে না। মানবিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে এই মানুষগুলোকে পাশে দাঁড়ানো এখন আমাদের সবার দায়িত্ব।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর-
প্রশ্ন ১: কড়াইল বস্তিতে আগুন লাগার কারণ কী ছিল?
উত্তর: আগুনের মূল কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রশ্ন ২: আগুন কখন শুরু হয় এবং কখন নিয়ন্ত্রণে আসে?
উত্তর: আগুন মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর ২০২৫) বিকেল ৫:২২ মিনিটে শুরু হয় এবং প্রায় ১৬ ঘণ্টার চেষ্টায় বুধবার সকালে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে।
প্রশ্ন ৪: ক্ষতিগ্রস্ত মানুষরা এখন কোথায় আশ্রয় নিয়েছেন?
উত্তর: অধিকাংশ মানুষ আশপাশের রাস্তায়, খোলা মাঠে বা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।
প্রশ্ন ৫: আগুনে কোনো প্রাণহানি হয়েছে কি?
উত্তর: এখন পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি, তবে কয়েকজন আহত হয়েছেন।
প্রশ্ন ৬: সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে?
উত্তর: ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রম শুরু করেছে।
প্রশ্ন ৭: ভবিষ্যতে করাইল বস্তিতে আগুন প্রতিরোধে কী করা উচিত?
উত্তর: নিরাপদ বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপণ প্রশিক্ষণ এবং সুনির্দিষ্ট জরুরি পরিকল্পনা জরুরি।

