বলিষ্ঠ কণ্ঠধারী ওসমান হাদি আর নেই: এক যুগের অবসান-
বলিষ্ঠ কণ্ঠধারী ওসমান হাদি আর নেই—এই সংবাদটি শুধু শোক নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক শূন্যতার ঘোষণাও বটে। ১৮ ডিসেম্বর রাত পৌনে দশটার দিকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তিনি ছিলেন একাধারে জুলাই যোদ্ধা, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং ঢাকা-৮ আসনের নির্বাচন প্রার্থী—একটি নামের ভেতর লুকিয়ে ছিল সংগ্রামের বহু পরিচয়।
ওসমান হাদি: কণ্ঠের শক্তিতে যিনি আলাদা-
ওসমান হাদি ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন, যাদের কণ্ঠ শুনলেই বোঝা যেত—তিনি আপস করেন না। তার কণ্ঠে ছিল প্রতিবাদ, চোখে ছিল দৃঢ় বিশ্বাস। বলিষ্ঠ কণ্ঠধারী ওসমান হাদি আর নেই—এই বাক্যটি তাই শুধু আবেগ নয়, এটি বাস্তবতার নির্মম সত্য।
জুলাই যোদ্ধা হিসেবে ওসমান হাদির ভূমিকা-
জুলাই আন্দোলনে ওসমান হাদি ছিলেন সরাসরি মাঠের যোদ্ধা। তিনি শুধু বক্তব্যে নয়, রাজপথে উপস্থিত থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। একজন জুলাই যোদ্ধা হিসেবে তার ভূমিকা তাকে সাধারণ বক্তা থেকে সংগ্রামী নেতায় রূপান্তরিত করে। আন্দোলনের সময় তার কণ্ঠ ছিল সাহসের প্রতীক, যা হাজারো মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে পরিচিতি-
ওসমান হাদির নাম উচ্চারিত হলেই ইনকিলাব মঞ্চের কথা মনে পড়ে। তিনি ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র—একটি দায়িত্ব, যা তিনি পালন করেছেন নির্ভীকভাবে। সংবাদ সম্মেলন, জনসভা কিংবা আন্দোলনের মঞ্চে তার বক্তব্য ছিল স্পষ্ট, জোরালো ও দ্ব্যর্থহীন। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে তিনি আন্দোলনের ভাষাকে সাধারণ মানুষের ভাষায় পৌঁছে দিয়েছেন।
ইনকিলাব মঞ্চের প্রয়োজন ছিল এমন একজন মুখপাত্র, যিনি ভয় না পেয়ে সত্য বলবেন। ওসমান হাদি ঠিক সেই জায়গাটিই পূরণ করেছিলেন। তিনি কৌশলী বক্তব্য নয়, বাস্তব ও কঠিন সত্য বলতেন। এজন্যই বলিষ্ঠ কণ্ঠধারী ওসমান হাদি আর নেই—এই সংবাদ ইনকিলাব মঞ্চের জন্যও এক অপূরণীয় ক্ষতি।
ঢাকা-৮ আসনের নির্বাচন প্রার্থী হিসেবে ওসমান হাদি-
রাজপথের আন্দোলন থেকে সংসদীয় রাজনীতিতেও নিজের অবস্থান জানান দেন ওসমান হাদি। তিনি ঢাকা-৮ আসনের নির্বাচন প্রার্থী ছিলেন। এই সিদ্ধান্ত তার রাজনৈতিক সাহসেরই প্রমাণ। তিনি বিশ্বাস করতেন—পরিবর্তন শুধু স্লোগানে নয়, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতর থেকেও আনতে হবে, রুখতে হবে দুর্নীতি, অন্যায় ও অনিয়ম।
ওসমান হাদি নির্বাচনে অংশগ্রহণকে ক্ষমতার লোভ হিসেবে দেখেননি। তিনি এটিকে দেখেছিলেন জনগণের কণ্ঠ সংসদে পৌঁছে দেওয়ার একটি মাধ্যম হিসেবে। ঢাকা-৮ আসনে তার প্রচারণায় ছিল স্পষ্ট বার্তা—দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান, গণমানুষের অধিকার এবং ন্যায়ের রাজনীতি। ঢাকা-৮ এলাকার অনেক সাধারণ মানুষ তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন তার স্পষ্টবাদিতা ও সাহসী অবস্থানের কারণে। বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ হাদিকে সংসদ সদস্য হিসেবে দেখতে চেয়েছিল।
অসুস্থতা ও সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা-
১২ ডিসেম্বর, শুক্রবার দুপুর ২:২৫ মিনিটে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ঢাকা মেডিকেলে তার অস্ত্রপচার হয়েছে। তবে অবস্থা শঙ্কটাপন্ন হওয়ার এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫, সোমবার দুপুরে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়। দেশবাসীর আশা ছিল—এই বলিষ্ঠ কণ্ঠ আবার ফিরে আসবে। কিন্তু ১৮ ডিসেম্বর সেই আশা ভেঙে যায় তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।
১৮ ডিসেম্বর: একটি শোকাবহ রাত-
১৮ ডিসেম্বর রাত পৌনে দশটা—এই সময়টুকু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আন্দোলনকেন্দ্রিক ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বলিষ্ঠ কণ্ঠধারী ওসমান হাদি আর নেই—এই সংবাদ মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে এবং নেমে আসে শোকের ছায়া।
সহযোদ্ধা ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের প্রতিক্রিয়া-
জুলাই আন্দোলনের সহযোদ্ধা, ইনকিলাব মঞ্চের নেতারা ও রাজনৈতিক সহকর্মীরা গভীর শোক প্রকাশ করেন। অনেকেই বলেন—“আমরা একজন সাহসী যোদ্ধাকে হারালাম, কিন্তু তার আদর্শ হারায়নি।” তার সাথের সহকর্মী, ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ ও সাধারণ মানুষ তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ মিছিল ও ভাঙ্চুর করছে হাদির হত্যায় জড়িত ব্যাক্তিদের কঠোর শাস্তির দাবিতে।
সামাজিক মাধ্যমে স্মরণ-
সামাজিক মাধ্যমে তার বক্তৃতার ভিডিও, আন্দোলনের ছবি এবং উদ্ধৃতি শেয়ার হতে থাকে। মানুষ স্মরণ করে তার কণ্ঠ, তার চোখের ভাষা, তার নির্ভীক অবস্থান। তার মৃত্যুর আগাম বার্তা তিনি পেয়েছিলেন। তাকে মেরে ফেলার যে হুমকি দেয়া হত তা তিনি সামাজিক মাধ্যমে বহুবার বলেছেন। তবুও তার সাহসিকতার বক্তব্য ও কার্যক্রম সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের সর্বশ্রেণীর মানুষ শোকাহত।
ওসমান হাদির আদর্শ ও শিক্ষা-
তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন—রাজনীতি মানে সুবিধাবাদ নয়, রাজনীতি মানে দায়িত্ব। জুলাই যোদ্ধা হিসেবে, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে এবং ঢাকা-৮ আসনের নির্বাচন প্রার্থী হিসেবে—সব জায়গায় তিনি একই মানুষ ছিলেন। তিনি কোন অন্যায়ের সাথে আপস করেন নাই। তার কণ্ঠে অকপটে সত্য বের হয়েছে, বের হয়েছে অনিয়ম, দুর্নীতি, ফ্যাসীবাদি ও ভারত বিরোধীতা সম্পর্কে। তিনি নিজের জীবন ঝুকি জেনেও মাঠ ছাড়েন নাই, নিজের জীবনের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন নাই। তিনি তরুন সমাজের জন্য এক আদর্শ যা শিখাবে কিভাবে ইনসাফের জন্য লড়তে হবে, কিভাবে আজাদির লড়াইয়ে বলিষ্ঠ ও আপোষহীন হতে হবে। এক হাদি চলে গেছে কিন্তু তার আদর্শ মত চললে আমরা আজাদির লড়াইয়ে টিকে থাকব নতুবা আমরা ফ্যাসীবাদি ও ভারতের গোলামি করে যাব সারাজীবন।
স্মৃতিতে বেঁচে থাকবেন ওসমান হাদি-
বলিষ্ঠ কণ্ঠধারী ওসমান হাদি আর নেই—এই শূন্যতা শুধু একজন নেতার নয়, এটি একটি সাহসী কণ্ঠের অভাব। এমন মানুষ খুব কমই আসে। তার কণ্ঠ আজ নীরব, কিন্তু তার লড়াই, বক্তব্য ও আদর্শ মানুষকে পথ দেখাবে বহুদিন। ইতিহাস তাকে মনে রাখবে একজন জুলাই যোদ্ধা ও সংগ্রামী কণ্ঠ হিসেবে। তার রেখে যাওয়া পথচিহ্ন রয়ে যাবে। যতদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ দাঁড়াবে, ততদিন তার নাম উচ্চারিত হবে শ্রদ্ধার সঙ্গে।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর-
প্রশ্ন: ওসমান হাদি কি জুলাই যোদ্ধা ছিলেন?
উত্তর: হ্যাঁ, তিনি জুলাই আন্দোলনের একজন সক্রিয় যোদ্ধা ছিলেন।
প্রশ্ন: ইনকিলাব মঞ্চে তার ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর: তিনি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ছিলেন এবং আন্দোলনের প্রধান কণ্ঠ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রশ্ন: ওসমান হাদি কোন আসনের নির্বাচন প্রার্থী ছিলেন?
উত্তর: তিনি ঢাকা-৮ আসনের নির্বাচন প্রার্থী ছিলেন।
প্রশ্ন: তিনি কবে ও কোথায় মারা যান?
উত্তর: তিনি ১৮ ডিসেম্বর রাত পৌনে দশটার দিকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
প্রশ্ন: কেন তাকে বলিষ্ঠ কণ্ঠধারী বলা হতো?
উত্তর: তিনি নির্ভীকভাবে সত্য কথা বলতেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন ছিলেন।

