ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যাচেষ্টা: নেপথ্যে কী?-
শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে একটি চলন্ত রিকশায় থাকা অবস্থায় ওসমান হাদিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়—এই ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। প্রকাশ্য দিবালোকে, ধর্মীয় ইবাদত শেষে এমন একটি হত্যাচেষ্টার ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে।
এই ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যাচেষ্টা কেবল একজন ব্যক্তির ওপর হামলা নয়; বরং এটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অপরাধ প্রবণতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ-
গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর বিজয়নগরে রিকশায় যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে দুর্বৃত্তরা এসে তাকে গুলি করে।
ওসমান হাদিকে হাসপাতালে নিয়ে আসা মিসবাহ জানান, জুমার নামাজ পড়ে মতিঝিল বিজয়নগর কালভার্ট এলাকা দিয়ে রিকশায় যাওয়ার সময় দুইজন মোটরসাইকেলে এসে গুলি চালায়। এতে গুলিটি তার বাম কানের নিচে লাগে। গুলি করেই তারা পালিয়ে যায়। এরপর ওসমান হাদিকে রিকশায় করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে জরুরি বিভাগের ওয়ান স্টপ ইমারজেন্সি সেন্টার (ওসেক) চিকিৎসাধীন তিনি। মিসবাহ আরও জানান, চিকিৎসক জানিয়েছেন তার শরীর থেকে অনেক রক্ত বেরিয়ে গেছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক।
পূর্বে ওসমান হাদিকে হত্যাসহ নানা হুমকি-
গত ১৪ নভেম্বর ফেসবুকে একটি পোস্টে হাদি জানিয়েছিলেন, তাকে হত্যা, তার বাড়িতে আগুনসহ তার মা, বোন ও স্ত্রীকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়েছে। নভেম্বর মাসেই দেশি-বিদেশি ৩০টি নম্বর থেকে বিভিন্ন ধরনের হুমকিও পেয়েছেন বলে জানিয়েছিলেন হাদি। ওই দিন ওসমান হাদি লিখেছিলেন, ‘গত তিন ঘণ্টায় আমার ফোন নম্বরে আওয়ামী লীগের খুনিরা অন্তত ৩০টা বিদেশি নম্বর থেকে কল ও টেক্সট করেছে, যার সামারি হলো- আমাকে সর্বক্ষণ নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। তারা আমার বাড়িতে আগুন দেবে। আমার মা, বোন ও স্ত্রীকে ধর্ষণ করবে এবং আমাকে হত্যা করবে।’ তিনি নাকি পুলিশকেও জানিয়েছিলেন এই হুমকির কথা
এখন সার্বিক প্রেক্ষিতে প্রশ্ন ওঠে, কতটা নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছিল হাদিকে? অন্তর্বতীকালীন সরকারই বা কি পদক্ষেপ নিয়েছে সামাজিক ও ব্যাক্তিগত প্রতিরক্ষার জন্যে??
এখন যদি কেউ জানতে চান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনী কী দায়িত্ব পালন করছে? একটা ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর হয়তো ঘাতক বা হামলাকারীকে তারা ধরতে পারবে (যদিও সেটা আদৌ পারবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে)। কিন্তু যা ঘটে যাবে, তার ব্যথর্তার দায় কি তারা নেবে? আর নিলেই বা কী ক্ষতিপূরণ মিলবে তাতে? আরও একটি প্রশ্ন হলো- ঘাতক সনাক্ত করার পর তাদের কোনো ভাবে সরিয়ে বা গুম করে ফেলা হবে নাতো যাতে মূল হোতা পর্যন্ত না পৌছেতে পারে বা উদ্দেশ্য কি তা না জানতে পারে??
প্রকাশ্য স্থানে হামলা: কী বার্তা দেয়?-
ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যাচেষ্টা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—প্রকাশ্য স্থানে, দিনের বেলাতে যদি কেউ নিরাপদ না থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের হামলা কয়েকটি দিক নির্দেশ করে- অপরাধীদের ভয়হীনতা, নজরদারির ঘাটতি, পরিকল্পিত হামলা।
নেপথ্যে কী থাকতে পারে?-
ব্যক্তিগত শত্রুতা: ওসমান হাদি বর্তমান তরুন সমাজের কাছে একটি প্রতিবাদী মুখ। সে জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বে গুরত্বর্পূণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি একজন সাহসী ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রূখে দাড়ানোর বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর। তার সততা ও নৈতিকতার দরূন সবাই তাকে ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দেখতে চেয়েছেন যার প্রতিদ্বদ্বিতায় আছেন মির্জা আব্বাস। তরুন সমাজের চোখে ওসমান হাদি একজন যোগ্য রাজনীতিবিদ। তবে তার উপর এমন হামলা ব্যক্তিগত বিরোধ বা পূর্বশত্রুতা নাকি তদন্তে এই দিকটি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সামাজিক বা স্থানীয় বিরোধ: স্থানীয় প্রভাব, আধিপত্য বিস্তার বা সামাজিক দ্বন্দ্ব থেকেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে যদি ভুক্তভোগী এলাকায় পরিচিত বা সক্রিয় ব্যক্তি হন।
রাজনৈতিক বা আদর্শিক সংশ্লিষ্টতা: বাংলাদেশের বর্তমানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুবই আশঙ্কাজনক। নির্বাচন করতে সর্বদলের প্রতিযোগিতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এমনকি ক্ষমতার অপব্যবহার ও নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতের উপর ব্যাপক মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার পরিলক্ষিত হচ্ছে। পুরনো দলগুলো নতুন দলের আগমন মেনে নিতে পারছেন না যা ওসমান হাদির উপর গুলি চালানো প্রমাণ করে। বাংলাদেশের কিছু অসাধু রাজনীতিবিদরা চান না যে আগামী বাংলাদেশ ওসমান হাদির মত সুযোগ্য ও সৎ নেতার হাত ধরে এগিয়ে যাক। তাকে হত্যার উদ্দেশ্য রাজনৈতিক কারণে হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি তবে এর নেপথ্যতে কাদের হাত আছে তা এখন সুষ্ঠভাবে তদন্ত করলে জানা যাবে।
কারা জড়িত থাকতে পারে?-
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে—সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে, প্রত্যক্ষদর্শীদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে,ব্যবহৃত অস্ত্র শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির পেছনের রিকশায় ছিলেন মো. রাফি। তিনি ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার বর্ণনা দেন। শুক্রবার দুপুরে শরিফ ওসমান হাদিকে রাজধানীর বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট এলাকায় গুলি করা হয়। শরিফ ওসমান বিন হাদি- জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিপ্লবী নায়ক। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী। দেশদুনিয়ায় জনপ্রিয় মুখ। হেফাজতে ইসলাম, পিলখানা, শাহবাগের ফ্যাসিবাদী এবং চব্বিশের গণহত্যার বিচারের দাবী নিয়ে রাজপথে লড়ে যাচ্ছেন। ভারত এবং আওয়ামী গুপ্ত সন্তাসীরা দীর্ঘদিন হত্যার টার্গেট করছে বলে একাধিক দিন জনসম্মুখে কর্মসূচীতে জানিয়েছেন তিনি। শুক্রবার সেই টার্গেট মিশনের শিকার হয়েছেন এই জুলাই যোদ্ধা। দুই যুবক সকাল থেকেই মাস্ক পড়ে হাদির সাথে প্রচারণায় অংশ নেন। হাদির গতিবিধি নজর রাখেন। এক পর্যায় দুপুর ২টা ২০ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডে রাজধানী বিজয়নগরের কালভার্ট এলাকায় স্বল্প দূরত্বে গুলি চালান। গুলি করা চিহ্নিত দুই ব্যাক্তির বর্ণনা দিয়েছেন ওসমান হাদীর সঙ্গে থাকা দুই প্রত্যক্ষদর্শী ও তাঁর জনসংযোগ টিমের সদস্যরা। তাঁরা বলছেন, যিনি গুলি চালিয়েছেন তার তার চুল ছিলো কোকড়ানো। গায়ে কালো ব্লেজার, মুখে কালো মাস্ক, চোখে চশমা, পায়ে চামড়া রঙের জুতা। হাতে ছিলো সোনালী কালারের ঘড়ি। বয়স যুবকদের সারিতে পড়ে বলেই বলছেন তাঁরা। আর যিনি মটর সাইকেল চালিয়েছেন তার চুল ছিলো টেপার কাটিং। গায়ে নেভি ব্লু পাঞ্জাবি, গলায় খয়েরি রঙের প্রিন্টের চাদর, মুখে কালো মাস্ক, হাতে সাদা ঘড়ি। এবং পরণে আকাশি রঙের প্যান্ট ছিল।
ঘটনার ফুটেজ সংগ্রহ করে বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে একজনের কথা বার বার সামনে আসছে এবং এইটা নিয়ে আলজাজিরার সাংবাদিক জুলকার নাঈন তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন ছবি, ফুটেজ এরং একাধিক প্রমাণাদি ও যুক্তি দেখিয়েছেন। তিনি তার ফেসবুকে একটি পোস্টে লিখেছেন- বহুরুপী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান ওসমান হাদির ইনার সার্কেলে ঢুকে গিয়েছিল। তার এই পোস্টের পর পিনাকী, ইলিয়াস, সাদিক কায়েম সহ অনেকের মতে এই ব্যাক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা নিয়ে সন্দিহান। কারণ এই সাবেক ছাত্রলীগ নেতাকে বহু কার্যক্রম ও বহু জায়গার সমাবেশে হাদির সাথে থাকতে দেখা গেছে হয়তবা সঠিক সময়ে তাকে হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে ওসমান হাদির আশে পাশে উপস্থিত ও পর্যবেক্ষণে রেখেছিল। আপাতত সিসিটিভি ফুটেজ ও কিছু তথ্যের ভিত্তিকে দাউদ খানকে গ্রেফতার করার প্রচেষ্টা চলছে। এমনকি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ৫০ লক্ষ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করেছেন যারা ওসমার হাদিকে হত্যার চেষ্টায় জড়িত। বাকি আইন শৃঙ্খলা বা গোয়েন্দা সংস্থা এই হত্যার উদ্দেশ্যো ও এর পিছনে কোন দল কাজ করছে কিনা সেগুলো সঠিক ভাবে বের করবেন বলে সবাই আশাবাদী। সেই সাথে ওসমান হাদির সুস্থতা সবাই কামনা করছি রবের কাছে।
উপসংহার-
ওসমান হাদির মতো একজন বলিষ্ঠ, সাহসী ও সৎ নেতাকে গুলি করে দমন করার চেষ্টা প্রমাণ করে যে সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকা মানুষরা আজও কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের জন্য হুমকি। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে আদর্শ, সততা কিংবা জনগণের আস্থা ধ্বংস করা যায় না—ইতিহাস বারবার তা প্রমাণ করেছে। এই হামলা কেবল একজন ব্যক্তির ওপর নয়, বরং ন্যায়, নেতৃত্ব ও নৈতিক রাজনীতির ওপর সরাসরি আঘাত। ওসমান হাদির মতো নেতারা দমন হয়ে যাওয়ার জন্য জন্ম নেন না; বরং প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই তারা আরও দৃঢ় হয়ে ওঠেন। আজ প্রয়োজন এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সমাজের সব স্তর থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ—যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো সৎ কণ্ঠকে গুলির মুখে থামানোর দুঃসাহস কেউ না দেখায়।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর-
১.ওসমান হাদিকে কেন গুলি করা হয়?
-এখনো পর্যন্ত নিশ্চিত কারণ জানা যায়নি। বিষয়টি তদন্তাধীন।
২. হামলাটি কখন ঘটে?
-দুপুর ২টা ২০ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডে রাজধানী বিজয়নগরের কালভার্ট এলাকায় স্বল্প দূরত্বে গুলি চালান।
৩. তিনি কি এখন বিপদমুক্ত?
– তিনি চিকিৎসাধীন আছেন, তার অস্ত্রোপচার হয়েছে তবে তার অবস্থা বর্তমানে আশঙ্কাজনক।
৪. কারা এই হামলার সঙ্গে জড়িত?
-আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনো কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত করেনি। তবে সিসিটিভি ফুটেজ ও তথ্যের ভিত্তিতে দাউদ খান নামে সাবেক ছাত্রলীগ নেতাকে আটক করা হয়েছে।
৫.এই ঘটনার প্রভাব কী?
-এটি সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী নতুন নেতাদের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে।

