সিডনির বন্ডাই সমুদ্র সৈকতে ইহুদিদের উপর হামলা: সময় ও স্থান-
২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর রোববার বিকেল প্রায় ৫ টার দিকে, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরের জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র বন্ডাই সমুদ্র সৈকতে এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা ঘটে। এই সময় পার্কের কাছে আয়োজিত ছিল ইহুদি সম্প্রদায়ের “হানুকাহ উৎসব”, যা স্থানীয় সময় অনেক মানুষের উপস্থিতিতে উদযাপিত হচ্ছিল।
ঘটনাস্থলটি সাধারণভাবে শান্তি ও আনন্দের জন্য বিখ্যাত হলেও ওই সন্ধ্যায় সেখানে উৎসব চলাকালীন বন্ধু–সম্প্রদায়ের হাজারেরও বেশি লোক জড়ো হয়েছিল। এক থেকে দুই মিনিটের মধ্যেই অস্ত্রধারীরা আচমকা গুলি চালাতে শুরু করে, ফলে হতাহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। অস্ট্রেলীয় কর্তৃপক্ষ একে একটি “সন্ত্রাসবাদী হামলা” এবং “অ্যান্টিসেমিটিক” (ইহুদি-বিদ্বেষী) কাজ হিসেবে অভিহিত করেছে।
হামলার বিস্তারিত-
হামলাকারীরা একজন ৫০ বছর বয়সি সাজিদ আকরাম ও তার ২৪ বছর বয়সি নাভিদ আকরাম। তারা বাবা ছেলে এবং ভারতীয় নাগরিক। হামলার প্রধান সন্দেহভাজন সাজিদ আকরাম পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন এবং তার ছেলে নাভিদ হামলায় আহত হওয়ার পর পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসাধীন আছেন। ধারণা করা হচ্ছে তারা ইসলামিক স্টেটের (ISIS) আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত এবং তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদসহ বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
তাদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়: নিহত সাজিদ আকরাম (৫০), তিনি ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের হায়দ্রাবাদ শহরের বাসিন্দা ছিলেন। তেলেঙ্গানার পুলিশ মহাপরিচালক জানিয়েছেন, সাজিদ আকরাম ১৯৯৮ সালের নভেম্বরে স্টুডেন্ট ভিসায় অস্ট্রেলিয়ায় যান। তার আগে তিনি হায়দ্রাবাদ থেকে বাণিজ্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। নাভিদের বাবা সাজিদ আকরাম ভারতের নাগরিক এবং তার মা ইতালির নাগরিক। তাদের দুই সন্তান—এক ছেলে ও এক মেয়ে—অস্ট্রেলিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছেন এবং তারা অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক।
অস্ট্রেলিয়ান পুলিশ জানিয়েছে, বাবা ও ছেলে গত মাসে ফিলিপিন্স সফর করেছিলেন। সে সময় সাজিদের কাছে ছিল ভারতীয় পাসপোর্ট এবং নাভিদের কাছে অস্ট্রেলিয়ান পাসপোর্ট। ওই সফরের উদ্দেশ্য, কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা বা প্রশিক্ষণ গ্রহণের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে নাভিদ আকরামের মা বলেন, ‘আমরা এ হামলার কথা ভাবতেও পারিনি, আমরা প্রায়শই তার কাছে অস্ত্র লাইসেন্স থাকার কথা বলতাম।’ তিনি তার ছেলেকে অত্যন্ত ভালো ছেলে বলে দাবি করেছেন যে নাকি কোন আড্ডা বা নেশা করত না। তার কাজে মনোনিবেশ ছাড়া কিছু সন্দেহ করার মতন আচরণ পরিলক্ষিত হয়নি বলে তার মা জানান। তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না যে এমন কাজে তার স্বামী ও ছেলে জড়িত থাকতে পারে।
হতাহতের সংখ্যা ও আহতদের অবস্থা-
এই হামলায় হতাহতের সংখ্যা অত্যন্ত ভয়াবহ ছিল। এখন পর্যন্ত ১৬ জনের মত মানুষ নিহত হয়েছে, যার মধ্যে একটি শিশু ও বিভিন্ন বয়সের সাধারণ মানুষ ছিলেন। ৪০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
আহতদের মধ্যে পুলিশ সদস্যও ছিলেন এবং বেশ কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর হলেও স্থিতিশীল বলে জানানো হয়েছে। এই হামলা অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বন্দুক হামলার ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেটি ১৯৯৬ সালে পোর্ট আর্থারের পর থেকে সর্বোচ্চ প্রাণহানির সংখ্যা অনুধাবন করেছে।
সাহসিকতা: হামলার সময় আহমেদ নামক একজন মুসলিম পথচারী, ড: জেমস সেবেস্টা, অন্যান্য পথচারী ও নিরাপত্তা কর্মীসহ হামলাকারীদের নিরস্ত্র করার চেষ্টা করে সাহসিকতা দেখান, যার ফলে আরও প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। বন্দুকধারীর অস্ত্র কেড়ে নিতে গিয়ে আহমেদ তিনি গুলিবিদ্ধ হন, কিন্তু তার সাহসিকতায় বহু মানুষের প্রাণ বাঁচে। তার সাহসিকতার জন্য তিনি এখন প্রশংসিত আর প্রশংসা করার মতই। এই হামলার লক্ষ্য যাই হয়ে থাক না কেন তবে ইহুদী বিদ্বেষী হওয়ার কারণে কারও প্রাণ কেড়ে নেয়া যুক্তিসঙ্গত নয় আর আমাদের ইসলাম তার সমর্থনও করে না।
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া-
প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ হামলাকে “অপমস্তক অ্যান্টিসেমিটিক সন্ত্রাস” বলে নিন্দা করেছে এবং সে দেশের সম্প্রদায়ের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছে।
নিউ সাউথ ওয়েলস (NSW) পুলিশ ও সরকারী কর্মকর্তারা হামলাকে জাতিগত বিদ্বেষ ভিত্তিক সন্ত্রাসী কার্যকলাপ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
হামলার পর বন্ডাই এলাকায় নিরাপত্তা আরও তীব্র করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ঘোষণা এসেছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া:
- ইসরায়েল, ভারত ও অন্যান্য অনেক দেশ এই হামলার নিন্দা জানিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
- কিছু দেশ তাদের নিজ দেশে সন্ত্রাসবিরোধী নীতিমালাকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছে এবং সংহতি প্রকাশ করেছে।
অ্যান্টিসেমিজম বাড়ছে?-
এমন সত্যতা রয়েছে যে সাম্প্রতিক সময়ে অস্ট্রেলিয়ায় ইহুদি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা বা বিদ্বেষমূলক কার্যকলাপের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। অচিরেই হওয়া নানা অ্যান্টিসেমিটিক, হুমকি, ও ধারাবাহিক অপব্যবহার বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে, কিছু বিশ্লেষক এটিকে হামলার পেছনের কারণ হিসেবে দেখছেন।
দ্বিধাহীনভাবে বলা যায়, এই হামলা শুধু একটি বন্দুকধারীর উগ্রতা নয়, বরং একটি বিশাল সামাজিক ও নিরাপত্তা সংকটের প্রতিফলন — যেখানে নৃশংসভাবে নির্দোষ মানুষদের লক্ষ্যবস্তু করে ফেলা হচ্ছে।
তবে এইসব বিদ্বেষমুলক আচরণ মুসলিম সম্প্রদায়কে সামাজিক, রাজনৈকিত ও বৈশ্বিকভাবে হেয় করে তুলছে এবং তারা মুসলিমদের জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ ট্যাগ দেওয়ার মত সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। তবে এই ঘটনার সঠিক কারণ ও এর পিছনে কাদের হাত ও উদ্দেশ্য আছে তা বের করা নিয়ে আমরা আশাবাদী। আমাদের নিরীহ ফিলিস্তিনিদের যে রক্তের বন্যা ইসরায়েল জাতি ঝড়িয়ে যাচ্ছে তার হিসেব এইভাবে কোন সাধারণ ইহুদী হত্যা দিয়ে সমর্থন আমরা জানাতে চাই না, চাই না আমরা ইসরায়েলের মত মতাদর্শ, কোন সাধারণ ইহুদী হত্যার মধ্য দিয়ে।
উপসংহার-
২০২৫ সালের বন্ডাই হামলা অস্ট্রেলিয়ার জন্য একটি গভীর শোক ও নিরাপত্তা সংকটের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই একক ইভেন্ট শুধু নির্দোষ মানুষের জীবনের ক্ষতি করেনি, বরং সমাজে বিদ্বেষ বা ঘৃণা ভিত্তিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধেও সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত—দ্রুত ও স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ, যাতে ভবিষ্যতে এমন ভয়াবহ অপরাধে সাধারণ মানুষ আবার কখনো পতিত না হয়।
প্রায়শই জিজ্ঞেস করা প্রশ্ন-
১.সিডনির বন্ডাই সমুদ্র সৈকতে হামলা কখন হয়েছিল?
-১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ রোববার বিকাল প্রায় সন্ধ্যা ৫টার সময় এই হামলা ঘটে।
২. হামলার পেছনের উদ্দেশ্য কী ছিল?
-এটি একটি অ্যান্টিসেমিটিক সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা ইহুদী সম্প্রদায়ের উৎসবের সময় সংগঠিত হয়।
৩.হতাহতের সংখ্যা কত?
-প্রাথমিকভাবে ১৫–১৬ জন নিহত হয়েছে এবং প্রায় ৪০ জন আহত হয়েছে।
৪. হামলাকারীরা কে ছিল?
-হামলাকারীরা বাবা ও ছেলের যুগল, যেখানে একজন মারা যাওয়া ও অপরজন আহত অবস্থায় ধরা পড়ে।
৫.অস্ট্রেলিয়া কি এই ঘটনাকে সন্ত্রাসী হামলা বলেছে?
-হ্যাঁ, NSW পুলিশ ও প্রধানমন্ত্রী এটিকে কাঠামোবদ্ধ অ্যান্টিসেমিটিক সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

